গুল্লুর দাঁতে ব্যথা, এই নিয়ে বাসার সবাই শঙ্কিত
। আম্মু আমার ঘরে গুল্লু কে নিয়ে বসে আছে । আমারো আজকে মাথার বাম পাশে ব্যাথা ।
আমার একটা পিতলের চুলের কাটা আছে , ওইটার
মাথাটা একটা গোল আংটার মত । আমি
মাথায় বাড়ি দিচ্ছি গোল দিকটা দিয়ে , এতে
যদি আমার মাথা ব্যাথা কমে কিন্তু গুল্লু ক্রমাগত কেঁদেই যাচ্ছে । নয় বছরের গুল্লুর দাঁত ব্যাথা বেশি
প্রবল না আমার মাথা ব্যাথা তা আমি অনুমান করতে পারছি না । আমার ইচ্ছা করছে চুলের কাঁটাটা আমার মাথায় ঢুকিয়ে দেই, বাম পাশের যেখানে ব্যাথা করছে সেই পয়েন্টে সুঁইয়ের
মত করে একদম মগজের ভিতরে। করা সম্ভব না কিন্তু তাও কপালের উপর লাগিয়ে- ধরে বসে আছি ।
গুল্লুর কান্না বাড়ছে । আম্মু এর মধ্যে গরম
পানিতে লবন গুলিয়ে এনেছে , এটা দিয়ে কুলি করতে হবে । গুল্লু একবার মুখে নিল আর
কুলি করা পানি বারান্দায় ফেলে দিল । আমি
বললাম বাইরে ফেলতে, না, তার বারান্দার মেঝেতেই ফেলতে হবে । এভাবে দুইবার করল । রাগ
উঠছিল আমার । সে প্যান্ট পরে নাই আজকে । আম্মুর একটা কামিজ পরে আছে , সেইটা মরু
অঞ্চলের আলখাল্লা হিসেবে চালিয়ে দেয়া যায় ( কারুকাজ বাদে ) । গুল্লু কে দেখে যে
কেও মজা পাবে, যা পরে আছে তা বড়ই আরামদায়ক , ঢিলা-ঢালা ,
ভেন্টিলেটেড। কান্না থামাবে না বলে যেহেতু সে আজকে সিধান্ত নিয়েই নিয়েছে , আম্মু
শুরু করল গল্প বলা ।
আমি যখন অনেক ছোট , তখন একবার ছুটিতে
টাঙ্গাইলে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলাম । সেইবার সব চাচাতো- ফুফাতো ভাই বোনেরা দাদার বাড়িতে ছিল । কোন গরমের বা শীতের ছুটি ছিল মনে হয় । শাহজাহান
ভাই, রঞ্জু ছিল, বেদানা আপা তো শ্বশুর বাড়িতে থাকত তাই সে তার ছেলে মেয়েদের নিয়ে এসেছিল । এখন ঘটনা হল
সবাই যেখানে হই চই করছে আমার সেখানে দাঁতে ব্যাথা
আর গালের একপাশ ফুলে ঢোল হয়ে আছে । বেদানা আপা আমাকে বলল সে আমাকে এক বান্ধবীর
বাড়ি নিয়ে যাবে ,ওই বান্ধবী দাতের পোকা সরাতে পারে । আমিতো দাতের ব্যথ্যায় কুপকাত
, এইটা শুনে মনে মনে একটু খুশি হলাম কিন্তু আহা উহু করলাম তার সামনে । বেদানা আপা আমাকে নিয়ে রওনা দিল । জানালা দিয়ে
শাহজাহান ভাই বলল ।‘ আই তোমরা কই যাও ? ‘
বেদানা আপা বলল , ‘ আমি শম্পাকে নিয়ে যাই , ওর দাতের পোকা
ফেলাইতে ।‘
‘আই ওইসব কোন কাজে আসবে না , তোমরা যাইয়ো না ।'
বেদানা আপা শুনল না , আমিও বেদানা আপার দলেই
ছিলাম , মনে হচ্ছিলো শাহজাহান ভাই আমার ভাল চান না । শুধু বেদানা আপাই চান ।
আমরা গ্রামের রাস্তা দিয়ে হাটছি তো হাটছি । আর
সেই বাড়ি আসে না । যাওয়ার পথে একটা বুড়া লোককে দেখলাম যার মাথার চুল বড় আর তাতে বিদ্ঘুটে জট। আমি ভাবলাম সে হয়ত কোন পীর জাতীয়
কেও । সালাম দিলাম । বেদানা আপা কোন গ্রায্যই করল না । উল্টা বলল , 'এই লোকটা গোসল
করে না তাই মাথায় জট '
আমি সেইদিন একটা জিনিশ শিখলাম যে গোসল না
করলে চুলে জট হয় ।
পথে অনেকেই আমাদের দেখে জিজ্ঞেশ করছিল,' আই
কে যায় রে ?' বেদানা আপা তো এই গ্রামেরই মেয়ে , পরে বুঝলাম তারা জানতে চায় আমি কে
।
আপা উত্তর দিল,'বি এস সি সাহেবের মেয়ে, ছোট
কাকার মেয়ে এইটা ।‘ তোমাদের নানা ওই গ্রামের প্রথম গ্রয়াজুয়েট , তাই সবাই তাকে বি
এস সি সাহেব বলত । সেইটা কখনো শুনতে ‘বিসচি’ মনে হত ।
আমরা অবশেষে যখন বেদানা আপার বান্ধবীর
বাড়িতে পৌঁছলাম তখন আমার পা ব্যথায় টন টন করছে । একজন গম্ভীর চেহারার মহিলা আসল
সামনে , হাসি দিল ছোট্ট করে । বেদানা আপা আমাকে দেখিয়ে বলল , ‘ ওর দাতের পোকা
ফেলাতে নিয়ে আসছি ।'
গম্ভীর মহিলা বলল , ‘ এর জন্য একশ একটা
দূর্বা ঘাশ লাগবে । বসো, আসতেসি।'
এর পর আমাদের বসিয়ে রেখে সে দূর্বা ঘাস তুলতে
গেল , গুনে গুনে একশ একটা তুলল সে । দেরি হচ্ছিল বলে আমি অস্থির হয়ে যাচ্ছিলাম ।
এক সময় সে আসল । ঘাস গুলা দিয়ে একধরনের বল
বানিয়ে এনেছে সে । এখন আমাকে ঘাসের বলের একটু উপরে মুখে রাখতে বলল আর সে শুরু করল
দোয়া পড়া । ব্যাস কিছুক্ষন পর দেখা গেল ঘাস থেকে একগাদা শাদা শাদা পোকা বের হয়ে
আসছে । একশময় পোকা পরা শেষ হলো আর আমাদের বলা হলো ,’পোকা আর নাই ।‘
আমরা খুশি মনে ফেরত আসলাম । তাকে বেদানা আপা
টাকা পয়সা কেন দিল না তার কারন হল সে আপার বান্ধবী এবং ঘুড়িয়ে পেচিয়ে একধরের
আত্মীয় ।
আমাদের বাড়িতে ফেরত আসার পর যখন আমি এই গল্প
শাহজাহান ভাইকে বললাম তিনি তো হেসেই খুন । বলে কি ওইগুলা নাকি পাটের পোকা আর
আমাদের বোকা বানানো হয়েছে । বেদানা আপা তার বড় ভাইকে দুই তিনটা বকা দিয়ে ভিতরে চলে
গেল আমি তার পিছন পিছন গেলাম কারন আমার মনে হচ্ছিল শাহজাহান ভাই উল্টা পাল্টা কথা
বলছেন । তার চেয়ে বেদানা আপা অনেক ভাল।
ওইদিন আমি আরেকটা জিনিশ শিখেছিলাম , শাহজাহান
ভাই যেহেতু এগ্রিকালচার নিয়ে পড়ত ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে তাই উনি জানতেন পাটের পোকা কিরকম ,কত প্রকার ও কি
কি । আমি যখন বোটানি নিয়ে পরা শুরু করলাম
তখন আমিও ভালোভাবে জানতে পারলাম । এই হল
আমার দাঁতের ব্যাথার কাহিনী । আমার এখনও মনে আছে । দেখলা ?
গুল্লু আম্মু গল্প শুনতে শুনতে কান্না
থামিয়ে দিয়েছে , আমার মনে হল মাথা ব্যাথা চলে গেছে ।
২। এখন একটা জিনিশ আমি বুঝলাম তা হলো , ছোট
ভাই বোনদের দাঁতে ব্যাথা হলে বড় ভাই বোনেরা মুখ্য ভুমিকা পালন করে । আম্মুর কাহিনি
অন্তত ৩৬-৩৭ বছর আগের । আজকের দিনে আমার মত অকম্মা বোন কি করতে পারে তার ভাইয়ের
দাঁতে ব্যাথা হলে ? আমার কাছে টাকা থাকলে তখনই ডাক্তার এর কাছে নয়ে যেতাম । একটু বেশি ভাল হলে লবন গরম পানি আমিই নিয়ে আসতাম । আমি কি করলাম ?
শুরু করলাম জ্ঞ্যন দেয়া । ‘ গুল্লু সোনা , আমার গুটুলি গুলয, আমার
ছোট্ট ভাইয়াটা , আমার বেস্ট গুল্লু ইন দা ওয়ার্ল্ড ! দেখো বেইবি তুমি প্রতিদিন দাত
ব্রাশ করতে চাও না তাই এরকম হল । কালকে থেকে কেও বলার আগেই ব্রাশ করবে । ঠিক আছে ?
এরকম আর হবে না যদি তুমি দিনে দুই তিন বার ব্রাশ কর । বুঝলা সোনা ? ‘
অনেক তেল মারলাম , আমি এইসব খুব পারি ।
এর পর আমার দাতের ব্যাথায় মরণাপন্ন ভাই বলল,
'তোমার ল্যাপির পাসওয়ার্ড দাও।' তার আবদার করার একটা ভঙ্গি আছে যার নাম পাপ্পি ডগ
ফেইস! সে এভাবে আবদার করল যে ৫ সেকেন্ডের জন্য আমার মনে হল অর পুরা দাত ব্যাথার
কাহিনি শুধু লাপটপে আনিমে দেখার জন্য। এর মধ্যে আম্মু বলল , ‘ দাও না জয়ি ,
ব্যাথাটা একটু ভুলে থাকবে । ‘
দিলাম, কি আর করা!
এর মধ্যে সে দেখল ঘুরল , আব্বুর সাথে
ধস্তাধস্তি করল , দাত ব্রাশ করতে গিয়ে আম্মুর কামিজটা ভিজালো । এখনো তার দাঁত ব্যাথা কমে নাই । খালি গায়ে ঘুমানোর
চেষ্টা চলছে । ব্যাথা এত প্রকট হল যে আম্মু ঠিক
করল ওকে প্যারাসিটামল দিবে । কিন্তু না খেয়ে তো আর দেয়া যাবে না । আমি
গেলাম গুল্লুর কাছে ।
‘ ভাইয়া , তুমি কি খাবা ? পাস্তা ? বানাব ?
‘
‘ না ( খুব নিচু স্বরে) । সকালে আম্মু
খাওায়সিল, ওইটার জন্যই ব্যাথা বাড়সে । উউউউ...’
‘তাহলে কর্ন ফ্লেক্স খাবা ? দুধ দিয়ে ? ‘
‘ না ওইটাতে বাদাম আছে , অই বাদাম গুলার
জন্যই আমার দাঁতে এত ব্যাথা !’
‘ তাইলে আমি তোমার জন্য স্ক্রাম্বল্ড এগ
বানায় আনি? ‘
‘এটা কি ? ‘
‘ এটা না মাস্টার শেফ এ বানিয়েছিল ‘
‘তাই ?’
‘ হা । এমন কি বার্নি স্টিন্সনের মা ও
বানিয়েছিল ! ‘
‘ও! তাহলে বানাও ‘
নামটা ইংরেজি আর আহামরি শুনালেও এটা একধরনের
পেয়াজ কাচামরিচ ছাড়া দিম পোচ করার নিয়ম । রান্না ঘরে গেলাম , দুইটা ডিম নিলাম ,
ফাটালাম , তাওয়া অনেক গরম করলাম , আগুন বন্ধ করলাম , এক চামচ মাখণ দিলাম তাওয়ায়,
এখন একটু লবন দিয়ে ডিম ঢাল্লাম , পাগলের মত নাড়লাম , ব্যাস ! রেডি। গিয়ে গুল্লুকে
দিলাম যেন কি না কি বানিয়ে ফেলেছি নাম তার
স্ক্রাম্বল্ড এগ!
গুল্লু খুব খুশি ! দিদি মাস্টার শেফ এর
রেসিপি বানাতে পারে , আর ওর জন্য বানিয়ে
এনেছে । যে বাচ্চাকে খাওয়ানোর জন্য আমার বাসার মানুষ দের দুশচিন্তার শেষ নাই সেই বাচ্চা এখন নিজে নিজে খেল আর আমাকে থ্যাঙ্ক
ইউ বলল । পেট ভরেছে , এখন তিনি ওষুধ খেতে পারবেন । আম্মু এনে খাওয়ালো । তিনি খুশি
মনে ঘুমাতে গেলেন ।
একটা ব্যপার সত্যি , দুই ভিন্ন যুগের বড় বোন
হলেও ! তারা চাপাবাজির সহায়তা নিয়ে থাকে ছোট ভাই বোনদের খুশি রাখার জন্য ।
No comments:
Post a Comment